নতুন খবরভারতবর্ষভারতীয় সংস্কৃতি

এক ব্যক্তির কাহিনী, যার কারণে আজ ভারতের লক্ষ লক্ষ শিশু প্রতিদিন বিনামূল্যে খাবার পাচ্ছে

নয়া দিল্লিঃ একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল, তারপর কৃষ্ণের ভক্তি এবং আধ্যাত্মিক পথকে গ্রহণ করে একটি নতুন জীবন শুরু করেছিল আইআইটি ছাত্র। ব্যাঙ্গালোরে অবস্থিত ইসকনের কর্তা হয়ে তিনি ‘অক্ষয় পত্র’-এর ভিত্তি স্থাপন করেন। অক্ষয়পত্র হল একটি সংস্থা যার মাধ্যমে দেশের 12টি রাজ্যের 19000টি স্কুলে প্রায় 18 লক্ষ পড়ুয়াদের বিনামূল্যে খাবার দেওয়া হয়।

যে ব্যক্তি লক্ষাধিক দরিদ্র শিশুকে খাওয়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি হলেন শ্রী মধু পন্ডিত দাস। নাগেরকয়েলে জন্ম নেওয়া পণ্ডিতজির জীবন কেটেছে ব্যাঙ্গালোরে। তিনি 1980 সালে আইআইটি মুম্বাই থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর শ্রীল প্রভুপাদের বই থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি কৃষ্ণভাবনা চর্চা শুরু করেন। 1983 সালে তিনি ব্যাঙ্গালোরে অবস্থিত ইসকনের কাজে জড়িত হন এবং ত্রিবান্দ্রম মন্দিরের সভাপতির দায়িত্বও নেন।

একদিন শ্রীল প্রভুপাদ কলকাতার মায়াপুরে তার বাড়ির জানালা দিয়ে উঁকি মারছিলেন, সেই সময় এক টুকরো খাবারের জন্য বাচ্চাদের এবং কুকুরের মধ্যে ভয়ঙ্কর ঝগড়ার একটি হৃদয় বিদারক দৃশ্য দেখেছিলেন তিনি। এই ঘটনা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি একটি প্রচারাভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন যা ইসকন মন্দির থেকে 10 মাইল দূরে প্রত্যেক ক্ষুধার্তকে বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ করবে। তার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা আজ একটি বড় ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। আর এভাবেই ইসকন মন্দির থেকে শিশুদের খাবার পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

আর এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে ধারাবাহিকভাবে। শিশুরা খাবারের আগে মন্দিরে চলে আসত। তখন পণ্ডিতজি মনে করতে লাগলেন যে বাচ্চারা হয় স্কুলে যায় না, বা মাঝখানে স্কুল ছেড়ে খাবার খেতে মন্দিরে যায়। 2000 সালের মার্চ মাসে দুজন ব্যক্তি পণ্ডিতজির সাথে দেখা করতে আসেন। তাদের একজন মোহনদাস পাই ইনফোসিসের সিএফও ছিলেন। মোহনদাসের পরামর্শ ছিল বাচ্চাদের স্কুলে গিয়ে খাবার দিতে হবে। তাঁর পরামর্শ মেনে পণ্ডিতজি নিজে স্কুলে গিয়ে বাচ্চাদের খাওয়াতে লাগলেন। তখন থেকেই শুরু হয় অক্ষয়পত্র ফাউন্ডেশনের।

এক সময় অনেক স্কুলের প্রিন্সিপালরা একটি চিঠিতে পণ্ডিতজিকে লিখেছিলেন যে, ইসকনের উচিত তাদের স্কুলের শিশুদেরও খাবার দেওয়া। এরপর পন্ডিতজি তাঁর কাজের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। ইসকন ব্যতীত অন্য স্কুলের শিশুরা শুধুমাত্র খাওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত স্কুলে নিজেদের স্কুল ছেড়ে চলে যেত। ক্ষুধা নিঃসন্দেহে একটি অনিবার্য বিষয় ছিল।

2000 সালে অক্ষয়পত্র সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রী নারায়ণ মূর্তি, সুধা মূর্তি এবং পন্ডিতজির আর্থিক সহায়তায় শুরু হয়েছিল। দেশের প্রথম কেন্দ্রীভূত এবং যান্ত্রিক রান্নাঘরের পরিকল্পনাটি ছিল মধুজির মস্তিষ্কপ্রসূত। খাবার তৈরি এবং স্কুলে পরিবহনের খরচ ছিল মাত্র 5.50 টাকা। প্রাথমিকভাবে, সমস্ত খরচ প্রতিষ্ঠান বহন করত, কিন্তু পরে সরকারী সহায়তাও শুরু হয়। একটি গ্যাসের চুলা এবং কিছু পিতলের পাত্র দিয়ে শুরু করা অক্ষয়পত্র আজ 18টি কেন্দ্রীয় আধুনিক রান্নাঘরের সাহায্যে দেশের 12টি রাজ্যের 19000 স্কুলে প্রায় 18 লক্ষ পড়ুয়াদের বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ করছে।

শিশুদের জন্য একটি দিনের খাবারের ব্যবস্থা করা একটি বড় উদ্দেশ্য বলে মনে হতে পারে না, কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী আকার সত্যিই বিশাল। এই সংস্থাটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি চ্যালেঞ্জ ক্ষুধা ও শিক্ষা নিয়ে কাজ করছে। সীমাহীন পুষ্টিকর খাবার দিয়ে শিশুদের স্কুলে যেতে আকৃষ্ট করার পাশাপাশি তাদের সার্বিক উন্নয়নের ওপরও জোর দিচ্ছে এই সংস্থা।

শ্রী মধু পণ্ডিত জি শুধু শিশুদের জীবনই বদলে দেননি, মন্দিরের ভাবমূর্তিও তুলে ধরেছেন। কোনও সামাজিক চিন্তা ছাড়া যে কোন বড় মন্দিরের অস্তিত্ব কতটা অসম্মানজনক হতে পারে, তা নিজেই ভেবে দেখুন। যদি আরও মন্দির এই প্রচারে যোগ দেয়, তবে সর্বোপরি ঈশ্বরও স্বর্গ থেকে আস্থাশীল হবেন এবং এই পৃথিবী আরও সুন্দর হয়ে উঠবে।

Related Articles

Back to top button