ইতিহাসবিশেষভারতবর্ষ

মুঘলদের তিন তিনবার হারিয়েছিলেন বাংলার বীর মহারাজা প্রতাপাদিত্য! ইতিহাস থেকে আজ বিলুপ্ত এই মহাযোদ্ধা

ভারতীয় ছাত্র সমাজকে বীরত্বের ইতিহাসের থেকে দাসত্বের ইতিহাস বেশি পড়ানো হয় এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। উদাহরণ হিসেবে একজন ভারতীয় ছাত্রকে জাহাঙ্গীর বা আকবরের বাবার নাম জিজ্ঞাসা করলে সে অনায়াসে বলে দেব। তবে সম্রাট শশাঙ্ক, সম্রাট অশোকের জীবন পরিচয় সম্পর্কে বলতে হিমশিম খাবে।

ইংরেজরা ভারত ছাড়া হয়েছিল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর কারণে, কিন্তু ইতিহাসে এমনভাবে দেখানো হয় যেন ইংরেজরা নিজের ইচ্ছায় ভারত ত্যাগ করেছিল। একইভাবে মুঘলদের তাড়াতে ভারতীয়দের বহু রক্তক্ষয় করতে হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস বিদেশী আতঙ্কবাদী মুঘলদের চরণবন্দনা করতে ব্যাস্ত।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ইতিহাস পাঠ্যপুস্তক বহু বীরের গাঁথাকে মুছে দিয়েছে। আজ এমনি এক মহান হিন্দু সম্রাটের সম্পর্কে জানাবো যার নাম শুনে দিল্লীর মুঘলদের সিংহাসন নড়ে যেত।

মুঘল সেনাকে তিন তিন বার ধূলিসাৎ করা সেই মহান রাজা ছিলেন বাংলার বীর মহারাজা প্রতাপাদিত্য। যার বীরত্বের কাহিনী শুনে শিবাজী মহারাজ ছত্রপতি শিবাজি হওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। এছাড়াও সুভাষচন্দ্র বসু সহ নানা স্বাধীনতা সংগ্রামী মহারাজা প্রতাপাদিত্যর কাহিনী পড়ে দেশকে স্বাধীন করার জন্য অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন।

সম্রাট প্রতাপাদিত্যের সম্পর্কে প্রথমত জানিয়ে দি, উনি ছোটো বয়সেই বাঘের সাথে যুদ্ধঃ করে নিজের বাহুবলে চোয়াল ছাড়িয়ে দিতেন। উনার অস্ত্রে ছিল স্বয়ং মা ভবানীর বাস। মুঘলদের অত্যাচারে যখন বাংলা তথা পুরো ভারতের হিন্দু সমাজে ভয় ও দুঃখের ছায়া তখন বাংলায় আবির্ভাব ঘটে মহা পরাক্রমী রাজা প্রতাপাদিত্যের।

যিনি জমিদারি থেকে শুরু করে হয়ে উঠেছিলেন এক মহান হিন্দু রাজা। যিনি মায়ানমারের কিছু এলাকা পর্যন্ত দখল করে নিয়েছিলেন। বর্তমানের দক্ষিণ ২৪ পরগনা, উত্তর ২৪ পরগনা, নদীয়া, যশোর সব এলাকা ছিল তার রাজত্বের অংশ। সংস্কৃতি ভাষায় দক্ষ ও বেদ পাঠে ছিল তার বিশাল পান্ডিত্য। রাজা প্রতাপাদিত্যের যশোহর সাম্রাজ্যের খ্যাতি সেই যুগে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।

মুঘলরা তিন তিন বার উনার রাজ্যকে লুট করার জন্য বিশাল সেনাবাহিনী প্রেরণ করে। তবে মা কালীর পরম ভক্ত প্রতাপাদিত্য এর মহাসেনার সামনে মুঘল সেনা টিকতে অক্ষম ছিল। প্রতাপাদিত্যের আমলে রাজ্য জুড়ে শান্তি ফিরে আসে,মানুষজন আরো একবার সুখী ও সমৃদ্ধ জীবনযাপন শুরু করে। রাজ্যকে শত্রুদের থেকে রক্ষা করতে গড়ে তোলা হয় বিশাল সেনাবাহিনী, সবথেকে বেশি জোর দেওয়া হয় নৌশক্তির উপর। অশ্বরোহি, তীরন্দাজ, গোলন্দাজ ইত্যাদি ৯ ভাগে বিভক্ত ছিল সেনাবাহিনী।

১৫৯৫ থেকে ১৫৯৮ পর্যন্ত রাজা প্রতাপাদিত্য মুঘলদের সাথে টানা তিনটি যুদ্ধ করেছিলেন। তিনটি যুদ্ধে হিজলপতি ঈশা খাঁ, মুঘল সেনানী শের খাঁ ও ইব্রাহিম খাঁকে পরাজিত করেছিলেন। ১৫৯৯ সালে আকবরের বশ্যতা অস্বীকার করে তার যশোরের সর্বাত্মক স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এইভাবেই বঙ্গদেশে হিন্দু রাজ শক্তির অভ্যুত্থানের ঘটনা দ্রুতবেগে পুরো ভারতে ছড়িয়ে পড়ে।

এমন মহান হিন্দু রাজার বীরত্ব ভারতবর্ষের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে পড়লে হিন্দু সমাজ অন্ধকারের মধ্যেও আশার আলো দেখতে শুরু করে। মুঘলরা বুঝতে পারে বাংলা থেকে বিশাল এক রাষ্ট্রবাদী শক্তির উত্থান ঘটছে যা পুরো ভারতে বিদ্যুতের বেগে ছড়িয়ে পড়ছে।

বেশকিছু দশক ধরে মহারাজা প্রতাপাদিত্যের কাছে মার খাওয়ার পর মুঘলরা ভারতের কিছু লোভী রাজাদের সাথে মিলে প্রতাপাদিত্যের উপর আক্রমন করেন। সেই যুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করেও, নিজের পরিবারকে বলিদান দিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি। পতন ঘটে এক মহান হিন্দু শাসকের সময়কাল।

উনার প্রেরণা পরবর্তীকালে শিবাজী মহারাজ থেকে শুরু করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করা বীরদের শক্তি জুগিয়ে গেছে। তবে দুঃখের বিষয় এই যে, মহারাষ্টের মানুষজন শিবাজী মহারাজকে ভোলেননি, রাজস্থান মহারানা প্রতাপ কে ভোলেনি, কিন্তু বাংলার মানুষ তাদের মহান হিন্দু রাজাদের ভুলে গেছে।

Back to top button
Close